কারো কারো জীবন কেবলই বয়ে চলে, ছন্দহীন দুঃসহ নিয়মে। বড় বেশি অসঙ্গতি আর বেমানান সে জীবন। এমন অপ্রত্যাশিত জীবনের ধকলের সাথে যারা পার করছেন নির্মম সময়, তাদের একজন মুক্তিযুদ্ধে স্বামী ও ছয় সন্তান হারানো, মেহেরজান বিবি। বেঁচে থাকার জন্য একটা সময় ভিক্ষাই ছিল যার শেষ অবলম্বন। আর ৮৮ বছর বয়সে এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মেলাচ্ছেন, জীবনের পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব।

বেঁচে থাকার প্রয়োজনে, নিজের ঠিকানা গড়তেই, মানুষের যতো যুদ্ধ। প্রায় সবারই ঠাঁই মেলে, কোথাও না কোথাও। কিন্তু কেউ কেউ সারাটা জীবন থেকে যান গণনার বাইরে, একেবারেই ঠিকানাবিহীন হয়ে। তেমনই একজন মেহেরজান বিবি।

জীবন যখন গড়ার সময়, তখনই তা ভেসে গেলো ভাঙ্গার অপ্রত্যাশিত ঘূর্ণিপাকে। ৮ ছেলে আর ২ মেয়ের মধ্যে স্বামী ও ৬ পুত্র শহীদ হলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে। তারপর আর কূল মিললো না তার। সেই থেকে চলছে জীবনের ভয়াল সংগ্রাম। যে স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব হারানো, সেই স্বাধীন দেশের মাটিতেই তার পা দুলতো ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে। স্বাধীন দেশ নিয়ে সবার যখন এতো দাম্ভিকতা, যেখানে দামি দামি গাড়ি-বাড়ির বিলাসিতা, সেখানে ধূসর চাহনিতে এই শহীদ জননীর কণ্ঠ গেয়ে ওঠতো,  দুটো পয়সা দেবে? ভাত খাবো।

চোখে-মুখে গন্তব্যের কোনো ছবি আঁকা নেই তার। লাল-সবুজের রঙ্গিন বাংলাদেশে তার জীবন আজ ফ্যাকাসে। শেষ বয়সে ফেনী জেলা প্রশাসন তার থাকার ব্যবস্থা করে দিলেও ভিক্ষে করেই খেতে হয় মেহেরজান বিবিকে। আর অসুস্থ হয়ে এখন তার ঠিকানা হয়েছে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের চারতলায়, মহিলা ওয়ার্ডের ৫৫ নম্বর বেড।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার খোঁজ রেখেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মহানয়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর্থিক অনুদানসহ মেহেরজান বিবিকে হজ্ব পালনও করিয়েছিলেন জাতির পিতা। অথচ আজ তার জীবন কাটে অনাহার-অর্ধাহারে।

মানবতা কি আবারো চোখ বন্ধ করে দিলো। মনুষত্বও কি জানালা বন্ধ করে দিলো? নয়তো একজন সুবেদার মেজরের স্ত্রী, শিক্ষিকা শহীদ জননী আজ ভিক্ষা করছেন কেন?

 

 

Recommend to friends
  • gplus
  • pinterest

About the Author

Leave a comment